মঙ্গলবার, ৬ জুন, ২০২৩

গাছের মৃত্যুরহস্য

 

বয়স হওয়ার (বার্ধক্যজনিত) কারণেও গাছের মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যু বলতে আমাদের চোখের সামনে যে ছবি ভাসে, গাছের মৃত্যুটা তেমন নয়

বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।

প্রবাদটি সবাই কম-বেশি জানি। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে শুধু ফল নয়, গাছ আমাদের সঙ্গে পরিচিত এর সবটুকু দিয়েই। কাণ্ড, পাতা, ফুল—গাছের সবই আমাদের কাজে লাগে। শুধু আমাদের কথা বলছি কেন, গাছ সব প্রাণীরই বন্ধু। ছায়া বা খাবারের উৎস হয়ে গাছ যেমন প্রাণীর জীবন বাঁচায়; তেমনি ঝড়, বৃষ্টি, খরা বা নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে লড়াই করে প্রকৃতির সঙ্গে। প্রাণীর মতো গাছেরও জীবন আছে। কেউ শক্তি প্রয়োগ করলে ভিন্ন কথা। এমনিতে গাছ এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়েই জীবন পার করে দেয়। তাই গাছ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না প্রাণীর মতো। এজন্য প্রাণীকে আমরা যতটা ছাড় দিই, গাছের বেলায় তা দিতে চাই না। গাছেরও যে জীবন আছে, সেটা মনে রাখি না অনেক সময়।

গাছের জীবন নানাভাবে শেষ হতে পারে। অর্থাৎ গাছ মারা যেতে পারে নানাভাবে। মারা যাওয়ার এই ধরনগুলোকে মোটা দাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। দ্রুত মৃত্যু ও ধীর মৃত্যু।

বয়স হওয়ার (বার্ধক্যজনিত) কারণেও গাছের মৃত্যু হয়
বয়স হওয়ার (বার্ধক্যজনিত) কারণেও গাছের মৃত্যু হয়

আগুন, বন্যা বা বাতাসের কারণে গাছের শেকড় থেকে কাণ্ডে পুষ্টি ও পানি আসার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে গাছ দ্রুত মারা যেতে পারে।

পোকামাকড়ের আক্রমণ বা রোগে আক্রান্ত হয়েও মারা যায় গাছ। এসব ক্ষেত্রে মারা যায় ধীরে। সময় লাগে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত। মারা যাওয়ার পেছনের কারণ এখানেও একই। গাছের সব অংশে ঠিকমতো পুষ্টি ও পানি পৌঁছে না। তবে এ ক্ষেত্রে খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায় ধীরে ধীরে।

মজার বিষয় হলো, বয়স হওয়ার (বার্ধক্যজনিত) কারণেও গাছের মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যু বলতে আমাদের চোখের সামনে যে ছবি ভাসে, গাছের মৃত্যুটা তেমন নয়। অর্থাৎ প্রাণীদের মতো গাছ মারা যাওয়া মানে সব শেষ নয়। বরং জীবনের নতুন স্রোতের সূচনা ঘটে সেখান থেকে।

আয়ুষ্কাল নির্ভর করে এর প্রজাতির ওপর। যেমন বিস্ট্রল পাইন প্রায় ৪ হাজার বছর ধরে বাঁচতে পারে।
ভিন্ন গাছ, ভিন্ন আয়ুষ্কাল
ভিন্ন গাছ, ভিন্ন আয়ুষ্কাল

ভিন্ন গাছ, ভিন্ন আয়ুষ্কাল

অবিশ্বাস্য রকম লম্বা সময় ধরে বাঁচতে পারে গাছ। আয়ুষ্কাল নির্ভর করে এর প্রজাতির ওপর। যেমন বিস্ট্রল পাইন প্রায় ৪ হাজার বছর ধরে বাঁচতে পারে। অন্যদিকে লজারপোল বা পপলার ধরনের গাছগুলো বাঁচে অনেক কম সময়। ২০ থেকে ২০০ বছরের মতো। আমাদের আশেপাশে, অর্থাৎ যেসব গাছ শহর বা জনপদে জন্মায়, সেগুলোর বেশিরভাগ এরকম সময় বাঁচে।

হয়তো খেয়াল করেছেন, ভিন্ন ভিন্ন জীবের আয়ুষ্কালও ভিন্ন। যেমন বিড়ালের চেয়ে হ্যামস্টার (ইঁদুরের মতো একধরনের প্রাণী) অনেক কম দিন বাঁচে। আবার বিড়ালের আয়ু মানুষের চেয়ে অনেক অনেক কম। শুধু মানুষের কথাই যদি ভাবি, পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষের গড় আয়ুও এক নয়। গাছের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। এদের আয়ুষ্কাল নির্ধারিত হয় ডিএনএ-র ওপর ভিত্তি করে। ডিএনএ হলো জীবনের নীলনকশা। এতে লেখা থাকে, একটি জীব কেমন হবে, তার খুঁটিনাটি সব। সে অনুযায়ী অনেক গাছ বেড়ে ওঠে ধীরে। আবার অনেক গাছ দ্রুত বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদের চেয়ে ধীরে বাড়তে থাকা উদ্ভিদ বেশি শক্ত হয়। বাঁচেও বেশিদিন।

বেঁচে থাকার অর্থ, মৃত্যু সুনিশ্চিত। তাই বেশিদিন বাঁচতে পারে, এমন গাছও একসময় বৃদ্ধ হয়। মারা যায়। তা ছাড়া, পোকামাকড়ের আক্রমণে বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্থ হয় গাছ। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবেও ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। গাছের একটি ডাল বা পাতা রোগাক্রান্ত হলে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো গাছে। একসময় ভেঙে পড়ে পুষ্টি ও পানি পরিবহন ব্যবস্থা। মারা যায় গাছ। মৃত্যুর এ প্রক্রিয়া অনেক ধীর হওয়ায় আমাদের কাছে সেটা বেশিরভাগ সময়েই দৃশ্যমান হয় না। অনেকে গাছ বা উদ্ভিদের মৃত্যুকে ভাবেন পরোক্ষ কোনো প্রক্রিয়া। সেটা আসলে আমাদের ভাবনার ধরনের জন্য। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল। গাছের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করি না বলেই হয়তো এমনটা মনে হয় আমাদের। আসলে, গাছ রোগাক্রান্ত হয়, ধীরে ধীরে অসহায়ভাবে মারা যায়। এই সবটা ঘটে গাছের দেহে। সেজন্য আমাদের মনে না হলেও, গাছের জন্য পুরো বিষয়টি বেশ সক্রিয়—তার ভেতরেই ঘটে।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: